২0000 টাকায় লদাখ ভ্রমন ৯ দিন

আমার মত অনেকেরই হয়তো স্বপ্নের জায়গা লাদাখ! সবারই ইচ্ছে থাকে লাদাখে একবার ঘুরে আসার, কিন্তু নানান কারণে হয়তো সবার হয়ে ওঠে না এই শখ পূরণ, অনেক কারণের মধ্যে একটা বড় কারণ প্রচুর খরচ। কিন্তু একটু ভাবনা-চিন্তা করে প্ল্যান করলে খরচ টা কমিয়ে আনা যায় অনেকটাই। যেকোনো ট্যুরের ক্ষেত্রে যেটা সবথেকে প্রয়োজন তা হলো সঠিক ইনফরমেশন এবং একটি সুন্দর নিখুঁত প্ল্যান। এই দুটি ঠিক থাকলে আপনার খরচ কমে যায় অনেকটাই। তার সাথে প্রয়োজন আপনার ভ্রমন সম্বন্ধে মানসিকতা। যারা ঘুরতে যায় তাদের মধ্যে দুই ধরনের মানুষ থাকে, প্লিজ কেউ ব্যক্তিগত ভাবে নেবেন না । একদল টুরিস্ট, যারা ঘুরতে যায় কিছুটা সময় উপভোগ করতে। ভালো হোটেল, ভালো গাড়ি, ভালো খাওয়া-দাওয়া এবং একটু বিনোদন এবং আশপাশটা ঘুরে দেখা, ছবি তোলা। এটি তাদের লক্ষ্য। আরেক দল আছে যারা ট্রাভেলার, কোন জায়গায় গেলে থাকা-খাওয়ার থেকেও যেটা তাদের মূল লক্ষ্য তা হল সেই জায়গাটা সম্বন্ধে জানা, ঘোরা, দেখা ও সেই সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপলব্ধি করা।তুঙ্গনাথে রাত কাটিয়েছি রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে টং এর ভেতরে, শুধুমাত্র মন্দিরের সামনে থাকব এবং পরের দিন ভোরে উঠে চন্দ্রশিলা পয়েন্টে পৌঁছে সানরাইজ দেখবো বলে (নিচে লিংক দিলাম)। যাই হোক আমি এখানে আমার ট্যুরের খরচের একটি বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা করলাম, তবে এখানে কে কি ওষুধ নিয়ে গেছে, কি কি খাবার নিয়ে গেছে, কে ওখানে কি কিনেছে তার কোন হিসেব নেই। কারণ সেটা ঘোরার অংশ না, তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ ঘুরতে গেলে ব্যাগ ভর্তি খাবার নিয়ে যায়, আবার অনেকে খালি হাতে বেরিয়ে পড়ে রাস্তায় কিনে খায়। কাউকে দেখেছি হলদিরামের 25 টাকা পিস লাড্ডু খেতে আবার কেউ নিয়ে যায় পাড়ার দোকানের 5 টাকা পিস লাড্ডু। যাদের শারীরিক অসুবিধা আছে তারা ওষুধ অনেক বেশি নেয়, আর অনেকে আছে যারা জ্বর, গা হাত পা ব্যথা, বমি আর কয়েকটা ব্যান্ডেড নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। আমি এখানে লাদাখ ঘোরার জন্য জেনারেল যেই খরচা গুলি হয় তা তুলে ধরার চেষ্টা করব।আমি লাদাখ যাওয়ার প্ল্যান শুরু করি ০৮ মাস আগে। লাদাখ যাওয়ার সময় এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর। এর মধ্যে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লোক বেশি থাকায় তখন সব কিছুর দাম বেশি থাকে। অথচ বাই এয়ার গেলে এপ্রিল মাসের শেষ দিক থেকেই আপনি সব কিছু খোলা পাবেন, এবং টুরিস্টের ভিড় অনেকটাই কম থাকার ফলে হোটেল গাড়ি সবকিছুই পাওয়া যায় অনেকটা কম দামে।

এরপর আসি গাড়িতে। আমার নয় দিনের ট্যুরে লে এয়ারপোর্ট থেকে এয়ারপোর্ট সম্পূর্ণ গাড়ি বুকিং ছিল মাত্র 35 হাজার টাকায়। মাঝে কোথাও গাড়ির জন্য এক পয়সাও দিতে হয়নি ড্রাইভার জাকিরকে। এক্ষেত্রে বলি আপনারা যখন গাড়ি বুক করবেন তখন ড্রাইভার একটি ইউনিয়ন রেট এর কথা বলবে, যা অনেকটাই বেশি। ওকে আপনারা পরিষ্কার বলবেন ওই রেটে আমি যাব না, আমি এই কদিন এখানে এখানে ঘুরবো, কত দিতে হবে বলো। কিন্তু যেখানে যেখানে প্ল্যান করছেন এগজ্যাক্টলি লোকেশন গুলো মেনশন করবেন এবং হোয়াটসঅ্যাপে তার কপি রাখবেন যেন পড়ে অসুবিধে না করে। একাধিক ড্রাইভার এর সাথে আমি আলোচনা করে তারপর একজনকে ফাইনাল করি, আমি ছবিতে সব ড্রাইভার এর ফোন নাম্বার দিয়ে দিলাম। আপনারা কথা বলে ঠিক করতে পারেন। ড্রাইভার 50000 টাকা বললে আপনি বলবেন 30000 টাকা তারপর দেখবেন সেটা 35 থেকে 37 হাজারে ফাইনাল হবে। তবে এই রেটে গেলে কোন রশিদ আপনাকে হয়তো নাও দিতে পারে,আমাদের দরকার পড়েনি তাই চাইনি। লাদাখে লে বাদে অন্য সব জায়গায় ইন্টারনেট এবং এটিএম পরিষেবা নেই বললেই চলে। তাই চেষ্টা করবেন ক্যাশ ক্যারি করতে। কোন হোমস্টে কার্ড এক্সেপ্ট করবে না। দিল্লি স্টেশন থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার জন্য সবচেয়ে কম আর বেস্ট উপায় মেট্রো, ভাড়া 30/- টাকা। ওলা বা উবেরে গেলে 300/- টাকার মতো পড়ে। সেটা 4 জনে ভাগ করলে হয় 300/4=75/-, মানে যাতায়াত 75*2=150/-টাকা। আমাদের সাথে লাগেজ থাকায় আমরা ওলা ব্যবহার করেছিলাম।
এরপর আসি হোটেল বুকিং এ। লাদাখে যেখানেই আপনারা থাকবেন সেখানে ফুডিং লজিং একসাথে বুক করবেন তাতে থাকার সাথে সাথে সকালের ব্রেকফাস্ট ও রাতের ডিনার পেয়ে যাবেন। কারণ ওখানে খাবার দাবার খুব কস্টলি। দুপুরের খাবার কোথাও ইনক্লুড করবেন না কারণ আপনি দুপুরে রাস্তায় ঘুরতে থাকবেন, সে ক্ষেত্রে ওটা আপনার নষ্ট যাবে। অফ-সিজনে গেলে কোথাও হোটেল বুক করে যাওয়ার দরকার নেই। কেবল মাত্র প্রথম দিনের হোটেল বুক করবেন,তারপর সেখানে গিয়ে ভালো লাগলে নেক্সট দিন থাকবেন অথবা চেঞ্জ করে অন্য হোটেল নেবেন দরদাম করে। আমি শুধুমাত্র হুন্ডারের হিমালয়ান ডেজার্ট ভিলা এবং লেতে প্রথম দিনের হোমস্টে বুক করে গিয়েছিলাম, পছন্দ না হওয়ায় ওখানে গিয়ে পরের দিন চেঞ্জ করি। আমি কোথায় কোন হোটেলে কত টাকায় ছিলাম তার বিবরণ নিচে হিসেবে দিয়ে দিচ্ছি। তবে এটুকু বলে রাখি দাম কমানোর অনেকটাই নির্ভর করবে আপনার ওপর, আপনি কতটা বার্গেনিং এক্সপার্ট তার ওপর দাম ধার্য হবে। লে তে আমরা যে হোমস্টেতে ছিলাম সেই হোমস্টে এমনি সময় পার হেড হাজার টাকা নিলেও আমাদের থেকে নিয়েছে 700 টাকা ফুডিং লজিং। প্যাংগং লেক এর কাছে যেই রুম সাড়ে তিন হাজার টাকায় দুজন ফুডিং লজিং দেয়, আমি বার্গেনিং করে সেটায় ছিলাম 2000 টাকা ফুডিং লজিং নিয়ে 3 জন পার রুম। এই ক্ষেত্রে আপনি কোন সময় যাচ্ছেন এবং আপনি কতটা কমাতে পারছেন তার ওপর নির্ভর করে।

উপসি বাদে বাকি প্রত্যেক হোটেলে আমাদের ফুডিং লজিং এর চুক্তি হওয়ায় ব্রেকফাস্ট এবং রাতের ডিনার হোটেল থেকেই দিত। আমাদের শুধু দুপুরের লাঞ্চ বাইরে কিনে খেতে হতো। আমরা দুপুরে যেহেতু অন জার্নি থাকতাম, তাই হালকা খাওয়ার চেষ্টা করতাম। রাতে হোমস্টে তে ফিরে পেট ভরে খেয়ে ঘুম।এবার আসি দুপুরের খাবারে। লে শহরে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে যেখানে চাইলে আপনি দুপুরে খেতেই পারেন। কিন্তু যদি খরচ কমাতে চান তাহলে লে মার্কেট থেকে গলির ভেতর দিয়ে উঠে যাবেন, দেখবেন অনেক তন্দুরি রুটির দোকান আছে। দেখবেন স্থানীয় লোকেরা নেওয়ার জন্য ভীড় করে আছে, প্রত্যেক রুটির দাম 12 থেকে 15 টাকা। ওই রুটি মেয়েদের ক্ষেত্রে একটা আর ছেলেরা দুটো খেলেই পেট ভরে যায়, বেশি নিলে নষ্ট হবে খেতে পারবেন না। এর পর মেন মার্কেটের জামে মসজিদের পাশের গলি দিয়ে ঢুকে গেলে ডান দিকে দেখতে পারবেন দুটো দোকান আছে যেখানে ছোট ছোট মাংসের পিস দিয়ে চিলি চিকেন মত করে। দাম আসি টাকা প্লেট। অথবা ডিসি অফিসের ওখানে একটি পাঞ্জাবী ধাবা আছে সেখানেও দাম কম খাবার ভালোই। এছাড়া পুরো লাদাখে আপনি দুপুরে খাবার জন্য রাস্তার পাশে ছোট-বড় ধাবা টাইপের দোকানে থালি সিস্টেমের মিল পাবেন, 70 থেকে 90 টাকার মধ্যে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *